বিদেশে পলাতক যুদ্ধাপরাধীদের ফিরিয়ে এনে দন্ড কার্যকর করা এবং পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অবিলম্বে শুরুর দাবি জানিয়েছেন একাত্তরে শহীদ বুদ্ধিজীবীর সন্তানরা।বুদ্ধিজীবী হত্যায় সরাসরি জড়িত চৌধুরী মইনুউদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতা আরো জোরদার করার উপর গুরুত্বারোপ করে বাসসকে তারা বলেন, এদের দন্ড কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত বিজয়ের অর্জন পূর্ণতা পাবে না।
পাশাপাশি তারা একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা এবং যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধেরও দাবি জানিয়েছেন।
রায় কার্যকরে দীর্ঘসূত্রিতা না করা এবং যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে আদালতের রায় কখনো পরিবর্তন করা যাবে না এমন একটি আইন প্রণয়নের আহবান জানিয়ে শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর সন্তান আসিফ মুনীর তন্ময় বলেন, ‘আমার পিতার হত্যাকান্ড এবং তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সাথে সরাসরি জড়িত ছিল চৌধুরী মইনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান। বিচারের রায় হয়ে গেলেও সে রায় কার্যকর হওয়ার ব্যাপারে একটা বড় প্রশ্ন সামনে রয়ে গেছে। আমার বাবার হত্যার সাথে জড়িতদের রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কাছে বিজয়টা অসম্পূর্ণই থেকে যায়। ’
ট্রাইব্যুনালের সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাক্ষী নিরাপত্তা আইন করা উচিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনারই একটা অংশ। এই বিচার হয়ে গেলেই আমাদের বাবাদের আত্মত্যাগ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে তা না। এর আরেকটি ধাপ হচ্ছে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো ১৯৫জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাদের অনুপস্থিতিতে শুরু করা যায় কিনা এ নিয়ে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করে একটা কিছু করা উচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের আবাসিক শিক্ষক শহীদ বুদ্ধিজীবী জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার একমাত্র সন্তান মেঘনাগুহ ঠাকুরতা বলেন, ‘বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত নায়কদের শাস্তি হয়েছে তাতে আমরা অনেক খুশি। এখনো কেউ কেউ বাকি আছে। যেমন চৌধুরী মইনুউদ্দীন ও আশরাফুজ্জামানের দন্ড কার্যকর করা যায়নি। বিদেশ থেকে তাদের ফেরত এনে বিচার কার্যকর করতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের কাছে আমরা দাবি জানাই। তা না হলে বিজয়ের অর্জন পূর্নাঙ্গ হবে না।
শহীদ ডা. এ এফ এম আবদুল আলীম চেীধুরীর সন্তান ডা. নুজহাত চৌধুরী শম্পা বাসসকে বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচারটা আমাদের জন্য অনেক বড় একটা অর্জন। কিন্তু কোন ব্যক্তির বিচার করে যদি মনে করি যে অনেক কাজ করে ফেলেছি, তাহলে ঠিক হবে না। ব্যক্তির বিচার প্রাথমিক ও প্রথম পদক্ষেপ। সাম্প্রদায়িক ধর্মভিত্তিক রাজনীতির যে বিষবাষ্প রয়েছে, সেই রাজনীতির মূলোৎপাটন করতে হবে অর্থাৎ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতের সংগঠন হিসেবে বিচার ও নিষিদ্ধ করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির মূলোৎপাটন না করা পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী ফল বয়ে আসবে না।’
আদর্শিক যুদ্ধ এখনো চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের শত্রুরা আরো সুসংগঠিত ও সুসজ্জিতভাবে এবং আন্তর্জাতিক কানেকশনসহ বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িত জঙ্গিবাদী দেশ হিসেবে পরিনত করার চেষ্টা করছে। আজকের জঙ্গিবাদ বিরোধী যুদ্ধ একাত্তরের যুদ্ধেরই ধারাবাহিকতা। সুতরাং একটি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শভিত্তিক সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু জামায়াতকে দল হিসেবে নিষিদ্ধ করাই নয়, জামায়াতী ও মৌলবাদী ভাবাদর্শে বিশ্বাসী সকল কর্মকান্ড নিষিদ্ধ করতে হবে এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মূলোৎপাটন করতে হবে। না হলে আমাদের অর্জন খন্ডিতই রয়ে যাবে।
আদালতের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের ফিরিয়ে এনে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, যে পাশ্চাত্য সমাজ মানবতা নিয়ে বড় বড় কথা বলে তাদের উচিত ত্রিশ লাখ শহীদের পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের যেই মাটিতে তারা যুদ্ধাপরাধ করেছে সেই মাটিতে ফিরিয়ে দিয়ে বিচারের মুখোমুখি করার ব্যবস্থা করা।
যুদ্ধাপরাধীদের সন্তান ও তাদের প্রজন্মকে সরকারি চাকুরি বা দায়িত্বশীল কোন পদে নিষিদ্ধ করার উপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক উদাহরণ রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যারা যুদ্ধাপরাধ করেছে তাদের ব্যাপারে বিধান হচ্ছে- তারা কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত নাগরিক সুবিধা পাবে, কিন্তু রাষ্ট্রের কোন গুরুত্বপূর্ণ পদ যেমন সরকারী দায়িত্বশীল বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন পদে অধিষ্ঠিত হতে পারবে না। কারণ যাদের রক্তে বিষ আছে, তাদের রক্ত পরিশোধিত না হওয়া পর্যন্ত দেশকে তারা কোনভাবেই ভালবাসতে পারে না। যে কোন সময় সুযোগ পেলেই তারা দেশবিরোধী কাজ করে যাবেই।
সেই সাথে যুদ্ধাপরাধীরা দেশবিরোধী কাজের মাধ্যমে যেসব সম্পত্তি অর্জন করেছে, তাদের সেসব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবার, বীরাঙ্গনাসহ রাষ্ট্রের কল্যাণে ব্যয় করতে হবে।
শহীদ বুদ্ধিজীবী মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর সন্তান তানভীর হায়দার চৌধুরী শোভন বাসসকে বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা অব্যাহত রয়েছে । এটা অত্যন্ত আশার ব্যাপার। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত যে বাংলাদেশের জন্য আমাদের পিতা ও স্বজনরা প্রাণ দিয়েছেন সেই বাংলাদেশ আমরা দেখছি না। বাংলাদেশে মৌলবাদের যে প্রসার ঘটেছে এটা সত্যিই আশঙ্কার বিষয়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের একার বিচার পাওয়া যতটা গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। যাতে এদেশে সকল সম্প্রদায়ের মানুষ সুখে শান্তিতে বাংলাদেশী হিসেবে বসবাস করতে পারে। এটা সবচেয়ে বড় সময়ের দাবি।’
দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবী, ডাক্তার, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সাংবাদিক হত্যার প্রধান আসামি চৌধুরী মইনুদ্দীন যুক্তরাজ্য এবং আশরাফুজ্জামান খান যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক রয়েছে। তাদেরকে ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
গত বছরের ২২ নভেম্বর আলবদর নেতা ও বুদ্ধিজীবী হত্যায় জড়িত জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসীর রায় কার্যকর হয় এবং চলতি বছরের ১১ মে মুক্তিযুদ্ধকালে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের নীলনকশা বাস্তবায়নকারী গুপ্তঘাতক আলবদর বাহিনীর প্রধান ও জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির দন্ড কার্যকর হয়।

ভাগ

কোন মন্তব্য নেই