লেখক : ইমরান মাহমুদুল

বাংলাদেশ টিমের টি-২০ ক্রিকেট খেলা উচিৎ কিনা আর খেললে প্রায় সম্পূর্ন আলাদা একটা দল নিয়ে খেলা উচিৎ কিনা এমন ভাবনা মাঝেমাঝেই মাথায় আসে। কারন… এই খেলাটা বল বাতাসে ভাসিয়ে বাউন্ডারি লাইন পার করার খেলা । এই ভার্সনে টেকনিকের চেয়েও গায়ের জোর বেশি দরকার হয়। বাংলাদেশ দলের অধিকাংশ ক্রিকেটারদেরই ব্যাটিং এবিলিটি গ্রাউন্ড শটস খেলার । আমাদের দেশে বাউন্ডারির সাইজ বড় হয় বলেই আমাদের দেশে যখন একটা ক্রিকেটারের হাতেখড়ি হয় তাদের শুরু থেকেই কোচেরা বল গ্রাউন্ড করে খেলার জন্য ফোকাস করতে বলেন। বাতাসে ভাসিয়ে খেলতে কমই উৎসাহিত করেন। কারনটা অযৌক্তিক নয়।

ভৌগলিক অবস্থানের ও ভেজাল খাবার খেয়ে বড় হবার কারনে আমাদের শারীরিক জোর অন্যান্য দেশের মানুষের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম । আর এদেশে মাঠের বাউন্ডারির সাইজও বড় । তাই অল্প শক্তি দিয়ে হাফভলি বলকে স্ট্রেইট/লং অন/লং অফে তুলে মারলে তা ক্যাচ আউট হবার রিস্ক থাকেই ( যেহেতু এই দিকের বাউন্ডারির সাইজ বড় ) ! আর যেদিকে অপেক্ষাকৃত ছোট তা হচ্ছে অফসাইড বা লেগসাইডের বাউন্ডারি। কিন্তু এই দুই দিকেও খুব একটা বাতাসে ভাসিয়ে বাউন্ডারি পার করার সুযোগ পান না আমাদের ঘরোয়া পর্যায়ে খেলা ক্রিকেটারেরা ! স্পেশালি পুল শট/ হুক শট…। কারন আমাদের দেশে ঘরোয়া ক্রিকেটের বেশিরভাগ পিচগুলোই এমন যে সেখানে পেস বল পুল শট খেলার মত উচ্চতায় ওঠেই কদাচিৎ ! দেশের আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন ডিভিশনের ক্রিকেট যদি মাঠে গিয়ে দেখেন তাহলে দেখতে পাবেন এসব ম্যাচে অনেক ব্যাটসম্যানই পেস বলে ব্যাটিং করে হেলমেট ছাড়া । কারন বলই তো জাগেই না । আর বোলারেরা ন্যাচারেলি বল অফ স্ট্যাম্পের লাইনে বল করলে সেই বল গ্রাউন্ড করে ড্রাইভ করে চার মারতে হয়, আর বল জাগলেও সেটা এতটা উচ্চতায় জাগে না যে সেটা পুল শটস খেলা যাবে । যে উচ্চতায় বাউন্স করে তা অফসাইডে কাট করা যায়। আর ওয়ানডে ক্রিকেটে উপমহাদেশের ও অস্ট্রেলিয়ার মাঠগুলোর কন্ডিশনে খেলার ধরনটাই এমন যে প্রতি ওভারে সিংগেলস/ডাবল মিলিয়ে ৪-৫ করে রান তুলে গড়ে প্রতি ২ ওভার পরে ১ টা বাউন্ডারি মারলেই হয়ে যায় । তাতেও দলের স্কোর ২৭০+ এসে যায় যা এসব কন্ডিশনে (ভারতের ব্যাটিং পিচ ব্যতীত) জয়ের জন্য ভালো টার্গেট হয়ে যায় । বাংলাদেশ দলের প্লেয়ারদের এই যোগ্যতা ভালোভাবেই আছে । তবে টি-২০ ক্রিকেটে এ ধরনের খেলা ভাত নাই । আপনি ৬ বলে ৬ টা সিঙ্গেলস নিলে আপনার রান হবে বড়জোর ১২০ । আর যতই ব্যাকরণসম্মত গ্রাউন্ড করে ক্ল্যাসিক শট মারেন না কেন মাঠ যতইই ছোট হোক না কেন বল ফিল্ডারের হাতেই যাবে আর আপনি বড়জোর ১ রান করে পাবেন , এভাবে ১ ওভারে আসবে ৬ রান ! আর অন্যদিকে তুলে মারায় অভ্যস্ত ও পারদর্শী প্রতিপক্ষ এক ওভারে ৬ টা বল সিঙ্গেলস না নিয়েও মাত্র ২ টা বল ব্যাটে লাগিয়ে ২ টা ছয় মেরে তুলে নেবে ১২ রান ! অর্থাৎ আমাদের রানের দ্বিগুন । আপনি হেরে যাচ্ছেন এখানেও । সৌম্য, সাব্বিরদের মত পাওয়ার হিটার বাদে বাকিরা যে ছয়গুলো মারে খেয়াল করলে দেখবেন মুশফিকুর রহিমের বেশিরভাগ ছয় সুইপে, মাহমুদ উল্লাহরও কিছুটা হাটু ভাজ করে মারা শটে, সাকিবেরও বেশিরভাগ ছয় এভাবেই আসে । স্ট্রেইট ছয় মারলেও বেশিরভাগই স্পিনারদের বলে ডাউন দ্যা উইকেটে এসে মারা শটস ! আর বিদেশীদের ছয়গুলো দেখেন – হাফভলি বল জায়গায় দাড়িয়েই স্ট্রেইট ব্যাটে অনায়াসে লং অন / লং অফ দিয়ে চালিয়ে ছয় মেরে দেয়। কারন তাদের টেকনিক এর সাথে যোগ হয়েছে গায়ের জোরও , আর বাংলাদেশের কম ব্যাটসম্যানই আছে যারা জায়গায় দাঁড়িয়ে সোজা ব্যাট চালিয়ে তুলে দিলে ছয় হয়ে যাবে । মোসাদ্দেক/ নুরুল হাসানেরা তাই যখন টি-২০তে নেমে দেখে ক্ল্যাসিক শটের ভাত নাই তাই চাপে পড়ে একটা ক্রসব্যাট শট চালিয়ে দেয় যা বেশিরভাগই ক্যাচে গিয়ে শেষ হয় ! অনেক কিংবন্তীদেরই বলতে দেখেছি যে “ আসল ক্রিকেট নাকি টেষ্ট” । আর আমাদের মোসাদ্দেক, মিরাজ, নাসির, নুরুল সোহান টাইপ ক্রিকেটারেরা কিন্তু মনে হয়না সেই আসল ক্রিকেটে খারাপ ব্যাট করবে কারন সেখানে কিন্তু বলে বলে তুলে মারার চাপ থাকে না । ২০০৫-০৬ এর দিকে ঘরোয়া ক্রিকেটে নাজিমউদ্দিন প্রায়ই চারদিনের ম্যাচগুলোতে সেঞ্চুরি করতো, কিন্তু অদ্ভুত লেগেছিল তাকে ২০০৭ টি-২০ বিশ্বকাপের দলে নেওয়া দেখে । যদিও নাজিম উদ্দিন সেবার টি-২০ উপযোগী ব্যাট করেছিলেন কিছু ম্যাচে কিন্তু সেই টি-২০ এর চক্করে আমরা কিন্তু সেই লংগার ভার্সনের নাজিমকে আর পাইনি ! আজকের যুগে মোসাদ্দেক হোসেনকেও এভাবে নষ্ট করা হচ্ছে কিনা আশংকায় আছি । টি-২০ ক্রিকেটে একটা প্লেয়ার ভাগেই পায় ২০ টা বল যদি ৬ টা ব্যাটসম্যান খেলে । তাই ২০ টা বল খেলার জন্যে আসলে মনে হয়না টেষ্ট ভার্সনের কার্যকরী প্লেয়ারদের নিয়ে তাদের অপব্যাবহার করা উচিৎ । হয় বাংলাদেশ টিম এই টি-২০ ভার্সন খেলা থেকে দূরে থাকুক ! নয়তো এই ভার্সনে তার চেয়ে জিয়া/ মেহেদি মারুফ টাইপ আই মিন ক্লিন হিটার টাইপ প্লেয়ার ঘরোয়া থেকে বের করে দলে নেওয়া বেটার … কারন ওই যে টি-২০ আসল ক্রিকেট না তাই ।

আমাদের দেশের পিচের প্যাটার্নের কারনে ২ টা পেসার দিয়ে দিনে মাত্র ১০ ওভার বল করিয়ে সারাদিন বাকী ওভার করানো হয় স্পিনার দিয়ে । বলা যায় আমাদের দেশের ক্রিকেটারেরা ঘরোয়া ক্রিকেটে যে রান করেন তার সিংহভাগই আসে স্পিন বল খেলে খেলে । পেসার ফেস করেন কম । বাউন্স বল তো ফেস করে একেবারেই কম ! তার প্রভাব টা পড়ে গিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে… স্পেশালি ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকার পেসবান্ধব বাউন্সি পিচে পড়লে । যেমনটা হয়েছে এবার নিউজিল্যান্ডে... দেশে সিরিজ খেললে লেগ বিফোর আউট হবার পরিমাণ অনেক থাকে । কিন্তু এবার নিউজিল্যান্ড সিরিজে বাংলাদেশের ৬ ম্যাচ মিলেয়ে ৫ টা প্লেয়ারও লেফ বিফোর আউট হয়েছে কিনা সন্দেহ রয়েছে। বেশিরভাগ আউটের পরিমাণ ক্যাচ আউটে, শর্ট বলে । কারন দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে শর্ট বল খেলায় অনভ্যস্ততা ।

এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে একটা কাজ করতে পারে বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসন ( এটা আমার একটা নিজস্ব মতামত) । তা হচ্ছে বাংলাদেশে কিন্তু আন্তর্জাতিক মাঠের সংখ্যাটা নেহায়েতই কম নয় । তার মধ্যে আবার বগুড়া, ফতুল্লা, খুলনা, সিলেট, কক্সবাজার এর মত আন্তর্জাতিক মাঠে আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয় না বললেই চলে। এছাড়াও বরিশাল , রাজশাহী, গোপালগঞ্জ, যশোরসহ আরো অনেক জায়গাতেই আন্তর্জাতিক মানের মাঠ আছে তবে হোটেল বা বিমান সুবিধা না থাকায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি তবে ঘরোয়া ক্রিকেট চলে । এসব মাঠের পিচগুলো কোনোটা অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড , সাউথ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড এর মতো করে বানানো উচিৎ। এটা করা খুবই সম্ভব , কারন আমাদের ক্রিকেট বোর্ড কিন্তু যথেষ্ট ধনী একটা বোর্ড আর আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেও একজন ক্রিকেট অনুরাগী। কাজেই এসব ব্যাপারে আর্থিক সমস্যায় পড়বে তা মনে হয় না । আর দেশের ভেন্যুগুলোর পিচ বাইরের বিভিন্ন দেশের পিচের প্যাটার্নে বানালে প্লেয়ারেরা হাতেখড়ি স্টেজ থেকেই সব ধরনের পিচে খেলে অভ্যস্ত হবার সুযোগ পাবে । আর তার সুফল দেখতে পাওয়া যাবে যেখন দেখবেন আজ থেকে ১০ বছর পরেই আগামী দিনে একটা নতুন বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটার বিদেশের কন্ডিশনে গিয়ে দাপটের সাথে খেলে এসে জিতে এসেছে ।

আশা করি এ ধরনের চেঞ্জ আসবেই বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনে। অবধারিতভাবেই আসবে। কারন ? দেখুন বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনে কারা ছিল এবং বর্তমানে আছে… ? নির্বাচক, ম্যানেজার ইত্যাদি দায়িত্বে যারা আছে তাদের মধ্যে টেষ্ট ক্রিকেট খেলেছেন এমন কেউওই ছিলেন না আগে । বর্তমানে নির্বাচক কমিটিতে হাবিবুল বাশার টেষ্টে খেলেছেন বটে । তবে আজকের সাকিব, মুশফিক, তামিম, মাহমুদ উল্লাহ, মাশরাফিদের মত ক্রিকেটারই কিন্তু আগামি ১০ বছরের মধ্যেই আসবেন বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনে বিভিন্ন দায়িত্বে। কেউ নির্বাচক, কেউ ম্যানেজার, কেউ কোচ হিসেবে। আর এই ব্যাচটা কিন্তু ভালো ক্রিকেট তো খেলেছেই সেই সাথে মানসিকতাতেও আগের প্রজন্মের চেয়ে আপডেটেড। সুতরাং ভালো কিছু আশা করতেই পারি আগামীতে……..……….

ভাগ